ড. মেজবাহ উদ্দিন তুহিন :
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ ও স্বকীয় সাতন্ত্রতা ছোট বেলা থেকেই এই ক্যাম্পাসের প্রতি এক অনন্য আকর্ষণ জাগিয়েছিল। অবশেষে ১৯৯০ সনেভর্তির সুযোগ ঘটেএই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগে। শহর থেকে দূরে আধুনিক যান্ত্রিক জীবনের প্রচন্ড উত্তাপের বদলে এখানে মায়াবী সুষমার হাতছানি অহর্নিশি হৃদয়ের আঙ্গিনায় দোলা দেয়। জাহাঙ্গীরনগরের ক্যাম্পাসে, আকাশের ক্যানভাস ও এখানকার প্রকৃতি আমাকে লেখালেখির প্রতি আগ্রহী করে তুলে। শিশু কাল থেকেই গ্রামে বড় হয়েছি ফলে গ্রামের প্রকৃতি ও জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসের প্রকৃতির সাথে নানা সাজুস্য খুঁজে পাই। স্কুল কলেজে পড়া অবস্থায় লেখা লেখি নিয়ে ভাবতাম কিন্তু আমার গ্রামীন জনপদে লেখা প্রকাশের তেমন কোন সুযোগ ছিলো না। এই প্রতিষ্ঠানে পা রাখবার পর লেখালেখির প্রতি আগ্রহ প্রবল হয়।
আজকের কাগজ পত্রিকা তখন নতুন বের হয়ে বেশ সাড়া জাডিয়েছে। ছোট একটি লেখা নিয়ে হাজির হই জিগাতলায় আজকের কাগজ পত্রিকা অফিসে।এই কাগজে ১৯৯১ সনেরসেপ্টেম্বর মাসেজীবনের প্রথম ছাপা হওয়া লেখা পত্রিকার পাতায় দেখে আনন্দে বুক ভরে যায়। এতে লেখার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। ক্লাসের এক ফাঁকে ছুঁটে যাই নাট্যচার্য সেলিম আলদীন ও খ্যাতিমান নাট্যকার সালাম সাকলাইনের কাছে। আমি স্কুলে পড়া অবস্থায় ১৯৮১ সালে উনারা গ্রাম থিয়েটারের কাজে আমার বড় ভাই সরকার নাজিম-ই-মজনুর সাথে আমাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় গিয়েছিলেন। আমার বড় ভাইআশির দশকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র এবং জাহাঙ্গীরনগর ও গ্রাম থিয়েটারের একজন নাট্য কর্মী ছিলেন। পূর্ব পরিচিত সালাম সাকলাইন ও নাট্যাচার্য সেলিম আলদীনের সহায়তায় ১৯৯১ সনে কাজ করার সুযোগ ঘটে দৈনিক খবরে। এভাবেই সাংবাদিকতা জীবনের শুরু। দৈনিক খবরের সাংবাদিক- আলতাফ মাহমুদ, মাশুক চোধুরী, আই্য়ূব ভূঞা, বিমল দত্ত,শাহেদ চৌধুরী , নজরুল ইসলাম মিঠু ও সম্রাট ভাই নিউজ ছাপতে অনেক সহযোগীতা করেছেন।
সংবাদ সংগ্রহের কাজে তখন প্রতিদিনই যাই বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ অফিসে। নাট্যকার সালাম সাকলাইন সেখানেই কর্মরত ছিলেন। জাবি সাংবাদিক সমিতি তখনও চিনিনা। অগ্রজদের সাথে জনসংযোগ অফিসে পরিচিত হয়ে তাদের হাত ধরেই যাতায়াত শুর হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি জাবিসাসের অফিসে। এক পর্যায়ে ১৯ মে ১৯৯৩ সনে নির্বাচনে জয়লাভ করে জাবিসাসের সাধারণ সম্পাদকের দয়িত্ব চাপে আমার কাঁধে। তখন জাবিসাসের অফিস ছিল আলবেরুনী হলের সামনে ভূতত্ত্ব বিভাগের পাশে। পরবর্তীতে টিএসসি চালু হলে সেখানে জাবিসাসের জন্যএকটি ছোট কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হয়। ভবিষ্যতে সমিতির কলেবর বৃৃদ্ধি পাবে ভেবে বর্তমান অফিসটি অনেকটা দাবী খাটিয়েই দখল নেয়া হয। পুরাতন অফিস থেকে কাঁধে করে সহপাঠী মনির, আশরাফ, অনুজ রবিন, মামুনসহও সমিতির সদস্যদের সাথে নিয়ে বই এবং জিনিসপত্র এনে জাবিসাসের অফিস গুছানো হয়। সাংবাদিক সমিতিকে অনেক বেশীভালবেসে সেখানে সময় দিয়েছি প্রচুর। দ্বিতীয় মেয়াদে আমাকে দায়িত্ব পালনের জন্য বলা হলে নিজেই নির্বচন দিয়ে দায়িত্ব হস্তান্তর করে অন্যদের সুযোগ করে দিয়েছিলাম। প্রয়াত অধ্যাপক আবুল হোসেন উপাচার্য থাকা কালীন তাঁর সহায়তায় সমিতির জন্য কিছু ফার্নিচার তৈরি করা হয়। জাবিসাসের উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল হক সমিতির জন্য বেশ কিছু বই উপহার দেন। উপহার হিসেবে প্রাপ্ত বই ও সমিতিতে থাকা আগের কিছু বই দিয়ে জাবিসাসের জন্য একটি মিনি লাইব্রেরি তৈরি করা হয়।
দৈনিক খবরের সংবাদ দাতা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা শুরু হয়।ক্যাম্পাস থেকে তেজগাঁও খবর অফিসের যোগাযোগ ছিল বেশ কঠিন। তখন যোগাযোগ এতটা সহজ ছিলনা। নির্দিষ্ট সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ঢাকায় যাওয়া আসা করত। তখন বাস যেত উসমানী উদ্যান পর্যন্ত। কখনও ক্লাসের ফাঁকে আবর কখনও ক্লাস শেষে ক্যাম্পাসে সংবাদ সংগ্রহ করে দুপুরের বাসে যেতাম ঢাকায়। উসমানী উদ্যান থেকে সামনে গোালাপ শাহের মাজারের পাশথেকে বাসে উঠে তেজগাঁও নাবিস্কোতে দৈনিক খবর পত্রিকা অফিস। নিউজ জমা দিয়ে পুনরায় নাবিস্কো থেকে বাসে উসমানী উদ্যানে ফিরে রাতের বাসে হলে ফিরতাম। ক্যাম্পাস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে ঢাকায় যেতে জাবি রিপোর্টারদের ভাড়া লাগতনা তবে গুলিস্থান – নাবিস্কো পর্যন্ত যাওয় আসায় খরচ হত দুই টাকা। দৈনিক খবর অফিস থেকে কোন পারিশ্রমিক পাওয়া যেতনা ফলে খাবারের টাকা থেকে বাঁচিয়ে এই বাস ভাড়ার টাকা যোগাড় করতে হত। রাত ৮টার পর ক্যাম্পাসে ফেরার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বাস ছিলনা। তখনকার সময়ে তেমন কোন পাবলিক বাসও ছিলনা ক্যাম্পাসে ফেরার। তাই বাস মিস করলে ক্যাম্পাসে আসাটা ছিল অনেকটাই অনিশ্চিত। কখনও কখনও টাউন সার্ভিসে গাবতলী পর্যন্ত এসে সেখান থেকে অনুরোধে দূর পাল্লার বাসে অথবা ট্রাকে করে রাতে ক্যাম্পাসে ফিরতে হত। কথনও কখনও ঢাকায় কোন আত্মীয়র বাসায় অথবা পরিচিত কারো মেসে রাত্রি যাপন করতে হতো।
ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ঘটনারনিউজ পাঠানোর মাধ্যম ছিল সরাসরি যাওয়া অথবা জরুরি প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিফোন একচেঞ্জ থেকে টেলিফোনে খবর পাঠনো। এনালগ টেলিফোনের লাইন মাঝে মধ্যেই ড্রপ হয়ে যাওয়ায় নিউজ পরিপূর্ণ ভাবে পাঠানো যেতনা। টেলিফোনের লাইন বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অপর পাশ থেকে কথা ঠিকমত বুঝতে না পারায় নিউজের গেপ তৈরি হত।ফলে বেশীর ভাগ সময়েই ঢাকায় পত্রিকা অফিসে গিয়েই নিউজ দিয়ে আসতে হত। ক্যাম্পাসের কোন নিউজ থাকলে যে ভাবেই হোক পত্রিকা অফিসে যেতে হত অথবা সহকর্মী কারো মাধ্যমে নিউজ লিখে দিয়ে দিতাম। অনুজ অর্থনীতির ইফতেখার আহমেদ রবিন দৈনিক ইত্তেফাকের জাবি সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করত সে মাঝে মাধ্যেই আমার নিউজ নিয়ে দৈনিকবাংলা অফিসে ড্রপ করত। তার উদারতা আমার প্রতি সম্মান ও ভালোবাসারই বহি: প্রকাশ।
কোন একদিন নিউজ শেষ করতে দৈনিক খবর অফিসেই রাত্র ১০টার বেশি বেজে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়র শেষ বাস ছিল রাত্র ৮টায়। দৈনিক খবর অফিস থেকে বেরিয়ে কোন গাড়ী পাচ্ছিলামনা। ভেবেছিলাম সেই রাত হয়তো রাস্তা বা পাত্রিকা অফিসের বারান্দায় কাটাতে হবে। রাত্র ১১টা বেজে গেল। পাশে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ব্যাচেলর কোয়াটারে এক সিনিয়র ভাইয়ের কাছে হাজির হলাম তিনি দরজা খুললেন তবে রাত্রি যাপনের অনুমতি দিলেননা। পেটে ক্ষুধার কথা ভুলে গেলাম কিভাবে রাত্রি যাপন হবে সে চিন্তায় চোখে মুখে অন্ধকার দেখছিলাম। পাসেই ছিল পলিটেকনিকের ছাত্রদের হল। অনেক শঙ্কা নিয়ে কয়েকজন ছাত্রকে অনুরোধ করায় তারা রাতে তাদের একজনের সিটে থাকার ব্যবস্থা করলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে পেটে ক্ষুধা নিয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। সেইকাতর স্মৃতি মনে হলে এখন ঘা শিহরে উঠে।
তবে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে ক্যাম্পাসের সকল স্তরের মানুষের সাথে পরিচয়ের সুযোগ ও ভালোবাসা পেয়েছি অনেক। তারা আমাকে সাহায্য করেছেন অকৃপন ভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মান্যবর উপাচার্য, শিক্ষক মন্ডলী, কর্মকর্তা কর্মচারী, অগ্রজ ও অনুজ অনেকের সাথে পরিচয়ের পাশাপাশি নানা কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ ঘটে। আমন্ত্রিত হয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রোগ্রামে । র্শিক্ষকদের সাথে বসে কথা বলার ও খাওয়ার সুযোগ হয়েছে অনেক। কারো কারো স্নেহ ভাজন হয়েছি সহজেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা প্রোগ্রামের নিউজ সংগ্রহ ও খবরাখবর সংগ্রহ ছাড়াও হৃদয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে প্রায় প্রতিদিনই বসতাম জনসযোগ অফিসে মীর আবুল কাশেম, নাট্যকার সালাম সাকলাইন ও কামাল ভাইয়ের সামনে।‘উনারা ভালোবাসা ও স্নেহের বন্ধনে সহযোগীতার হাত বাড়িয়েছেন অকৃপণ হাসিতে। সে সময়ে নিউজের জন্য ছবি সংগ্রহ এত সহজ ছিলনা। ফটোগ্রাফার আনিস ভাইয়ের কাছ থেকে ছবি সংগ্রহ করতে হত। তিনি সবসময়ই আমাকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে ছবি সরবরাহ করতেন সর্বাগ্রে।
ক্যাম্পাসে নিজ ভিাগে অফিস বানিয়ে শিক্ষকদের কেউ কেউ এনজিওর কাজ করতেন। এরকম একটি খবর দৈনিক বাংলায় ছাপা হওয়ার পর পরিসংখ্যাণ বিভাগের অধ্যাপক কবীর আমার বিরুদ্ধে প্রেস কাউন্সিলে মামলা করেছিলেন। তবে প্রেস কাউন্সিলের মামলাও জয়লাভ করতে পারেননি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাস ভর্তি করে তার প্রিয় ছাত্র/ছাত্রীদের পাঠিয়েছিলেন দৈনিক বাংলা অফিসে আমাকে ধরে আনতে। এতে অধ্যাপক কবীর অনেক শিক্ষক ও ছাত্র/ছাত্রীদের সমালোচনার পাত্র হয়েছিলেন।
দৈনিক খবরে ১৯৯১ সন থেকে ১৯৯৩ সনের জুন পর্যন্ত কাজ করেছিলাম। সেখানে নিজের পয়সা খরচ করে খবর পাঠনো এবং পত্রিকা অফিসে যাওয়া আসা করতে হতো। অনেকটা হাফিয়ে পড়লেও সাংবাদিকতার নেশা অন্তরে আরও চেপে বসে। অবশেষে ১৯৯৩ সনের জুলাই মাসে দৈনিক বাংলায় কাজ করার সুযোগ ঘটে ১৫০০/-টাকা সম্মানীতে। অগ্রজ সাংবাদিক সৈয়দ আবদাল আহমদ ও ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী দৈনিক বাংলায় চাকুরি পেতে সহায়তা করেন। সে সময়ে দেড় হাজার টাকা ছিলো আমার কাছে অনেক টাকা যা দিয়ে পুরো মাস ভালো ভাবে চলা যেত। দৈনিক বাংলায় কাজের পাশাপাশি রেডিও এবং বিটিভিতে স্ক্রীপ্ট লেখার সুযোগ তৈরি হয়। নিয়মিত ফিচার লিখতাম দৈনিক বাংলায়। দৈনিক বাংলার সম্পাদক আহমেদ হুমায়ুন, ফিচার সম্পাদক কামাল আহমেদ ও স্বচিত্র বাংলাদেশের সম্পাদক খালেদা এদিব চৌধুরী নিয়মিত ফিচার লেখার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। দৈনিক বাংলা অফিসে কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ তার টেবিলের সামনে বসিয়ে শিখিয়েছেন ফিচার লেখার কলাকানুন।দৈনিক বাংলায় কর্মরত সৈয়দ আব্দুল কাহহার, আশরাফ আলী, জহিরুল হক, জহিরুল আলম, কবি মজিদ মাহমুদ, ওমর ফারুক, রুহুল কুদ্দুস, রশিদুন নবী বাবু, মাহাতাব উদ্দিন,জাহেদ চৌধুরী, নাজমূল হাসান, সুমন মাহমুদ, রুহুল গনি জ্যোতি, শিল্পী সৈয়দ লুৎফুল হক সহ অনেকেই স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে আমাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। দৈনিক বাংলায় কাজ করার সুবাদে পরিচিতি ও লেখালেখির অঙ্গন আরও প্রসারিত হয়। যোগাযোগ ঘটে দেশ বিদেশের স্বনামধন্য সাংবাদিক ও বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের সাথে। লেখালেখির সুযোগ তৈরি হয় দেশবিদেশের নানা পত্রিকায়।
প্রতিদিনই ক্লাশ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন মিটিং বা সংবাদ সংগ্রহের কাজে চলে যেতাম। ফিরে এসে ডাইনিংয়ের খাবার পেতামনা। ভালোবাসার টানে কখনও কখনও ডাইনিং বয়রা আমার খাবারটা প্লেট দিয়ে ঢেকে টেবিলের উপর রেখে দিতো। দৈনিক বাংলায় কাজ পাওয়ার পর সাংবাদিকতার নেশা আরও প্রবল হয়ে উঠে। প্রায় দিনই হলে ফিরতাম রাত্র ১২ টা ১টায়। ফলে সে রাতেও হলের খাবর জুটতনা। গ্লাস ভর্তি পানি পেট পুরে ঘুমিয়ে পড়তাম সকালের অপেক্ষায়। ক্যাম্পাসের নানা আলোচনা ও নিউজ সংক্রান্ত বিষয়ে মাঝে মাঝে শিক্ষকেরা ডাকতেন তাদের বিভাগে আবার কখনও কখনও বাসায়। ইংরেজী বিভাগের শিক্ষক আবুতাহের মজুমদার অপত্য স্নেহে আপ্ত ভালোবাসায় কাছে টেনে নিজের বাসায় আপ্যায়ন করেছেন প্রায়শই। তিনি আমার পারিবারিক সমস্যায়ও সাহায্যের হাত প্রসারিত করেছেন। তাঁর প্রতি অকুন্ঠ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। থাকতাম মীর মশাররফ হোসেন হলে। প্রায়শ শিক্ষকদের বাসা অথবা টেলিফোন একচেঞ্জ থেকে খবর পাঠিয়ে হলে ফেরার পথে দেখা মেলত শিয়ালের বাসর খেলা। প্রান্তিক গেটে শিক্ষকদের বাসায় কাজ শেষে অনেক রাতে বৃষ্টিতে ভিজে ক্লান্ত বিষন্ন মনে হলে ফিরেছি তার পরও সাংবাদিকতার প্রতিটান কমেনি। কখনও কখনও রাতে প্রান্তিক গেটের কাছে নাট্যকার সালাম সাকলাইনের বাসায় রাত কাটিয়েছি। তিনি আমাকে সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে অনুপ্রাণিত করেছেন। মূলত তার হাতেই আমার সৃজনশীল লেখালেখির হাতে খড়ি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতিকে অনেক ভালোবেসে ছিলাম। সমিতির অফিস গোছানো, উপদেষ্টাকে নিয়ে নিয়মিত সভা করা, বই সংগ্রহ, সদস্যদের সাথে মতবিনিময় এসব কাজে অনেক সময় ব্যয় করেছি। এতে লেখা পড়ারও কিছুটা বিঘ্ন ঘটতো। তারপরও জাবিসাসকে ভালোবেসেই অনেক শ্রম ও সময় দিয়েছি সেখানে। সহপাঠী ও সহকর্মী মনির ছিল সবসময় পাশে। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় নানা পরামর্শ দিয়ে মনোবল যুগিয়েছেন ইত্তেফাকের জুলফিকার হায়দার বুলেট, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রয়াত শিবলী আহম্মদ ও লেখক আখতার হামিদ খান। সহপাঠী ও সহকর্মী সারোয়ার হোসেন, শোয়াইব জিবরান,শীলা কবীর, মাসুদ করিম, আহমেদ বুলবুল, আসাদ, মোস্তফা বাবু, কল্লোল,আশরাফ,মামুন,ওমর মুয়িদ ও মোহন আমাদের এক সাথে ক্যাম্পাসে সংবাদ সংগ্রহের নানা স্মৃতি ভাস্বর হয়ে আছে।
উপদেষ্টা প্রৃয়াত শামসুল হক ও ন্যট্যকার সালাম সাকলাইনের কাছ থেকে অনেক অনুপ্রেরণা ও সহযোগীতা পেয়েছি। সে সময়ে অস্থায়ী উপাচার্য অধ্যাপক আবুল হোসেন ও জাবিসাসকে সহযোগীতা ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। শিক্ষা, সংস্কুতি, গবেষণা, ক্রীড়া, ছাত্র আন্দোলন, জাকসু নির্বাচন, সিনেট সিন্ডিকেট নির্বাচন, দাবী আদায়ে অবরোধ, রেজিস্টার্ড গ্রাজুয়েট নির্বাচন, হলের সমস্যা, ডীন নির্বাচন, ছাত্রাবাসে নিম্নমানের খাবার, বাসে হামলা, মাদক, শিক্ষক সমিতি নির্বাচন, লাইব্রেরিতে বই সমস্যাসহ নানা খবর ও ফিচার ছেপেছি পত্রিকায়।
ক্যাম্পাসে ছাত্র শিক্ষকদের এক মুখোমখি সংঘর্ষ ঘটে১৯৯৩ সনের ২৯ জুলাই। সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ছাত্র হাফিজের বহিস্কারকে কেন্দ্র করে সে দিনসম্পর্কের অবনতি ও অবক্ষয় ঘটে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে।ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঐদিন কিছু সংখ্যক শিক্ষক উপাচার্য কাজী সালেহ আহমেদের ওপর চড়াও হয়েছিল। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে স্বচোখে দেখা সেই ঘটনা ও ক্যাম্পাসের পরিবেশ আজও মনে দাগ কাটে। ছাত্র শিক্ষক সংঘর্ষেরএই খবর বিবিসির মাধ্যমে বিশময়^ ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকে তিন মাস। হল বন্ধ থাকায় সাংবাদ সংগ্রহের জন্য প্রতিদিন ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে গিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করে পত্রিকা অফিসে রিপোর্ট করতে হতো।
পত্রিকার জন্য লেখা চাইতে গিয়ে শিক্ষকদের অনেকের সঙ্গে নিবীড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক আবু তাহের মজুমদার, অধ্যাপক হারুন অর রশিদ, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হায়াৎ মাহমুদ,অধ্যাপক শামসুল হক,অধ্যাপক দানিউল হক,অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান,অধ্যাপক খন্দকার মুজাম্মিল হক,অধ্যাপক খালেদ হোসাইন,,অধ্যাপক কাওসার হুসাইন, পুরাকীর্তি বিশারদ অধ্যাপক ড.এ কে এম শাহনাওয়াজ ও নাট্যাচার্য সেলিম আলদীন স্যারের সাথে ছিল নিয়মিত যোগাযোগ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, রাজনীতি ও প্রশাসনিক খবরের জন্য শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনেক সহযোগিতা পেযেছি। উপাচার্য কাজী সালেহ আহমেদ, অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম চৌধুরী,অধ্যাপক মুস্তাহিদুর রহমান,মফিজ উদ্দিন আহমেদ, মির্জা মোজাম্মেল হক, অধ্যাপক ড. কে. মউদুল ইলাহী,অধ্যাপক মেসবা-উস-সালেহীন, অধ্যাপক আজিজুল হক ভূঞা,অধ্যাপক মঞ্জুরুল হক,অধ্যাপক মঞ্জুরুল হাসান, অধ্যাপক শামুল আলম সেলিম অধ্যাপক মির্জা মফিজ উদ্দীন, অধ্যাপক ড. সুভাষ চন্দ্র দাস, অধ্যাপকড. সাবিহা সুলতানা, অধ্যাপক ড. শামসুল আলম,অধ্যাপক ড.এনামুল হক খান, অধ্যাপক আমির হোসেন খান, অধ্যাপক ইমাম উদ্দিন,অধ্যাপক আবুসাইদখান, অধ্যাপক মনিরুজ্জামান,অধ্যাপক মেসবাহ উদ্দীন আহমেদ, ড.আলাউদ্দিন আহমেদ,অধ্যাপক আব্দুল আউয়াল,অধ্যাপক জসীম উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবীরঅধ্যাপক সৌদা আখতার ওঅধ্যাপক এটিএম আতিকুর রহমান,অধ্যাপক শামুল আলম সেলিমপ্রমুখ শিক্ষকদের সাথে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৯০ সন থেকে ১৯৯৬ সন পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছি। প্রায় পুরো সময়টাই পত্রিকার সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। সে সময়টাতে ক্যাম্পাসে কোন কোন সংগঠনের অতর্কিত হামলা, লোকাল এন্ট্রি লোকাল ছাত্র সংঘর্ষ লেগেই থাকত। লোকাল এন্ট্রি লোকাল সংঘর্ষে ১৯৯৪ সালের ২৩ জুলাই মীর মশাররফ হোসেন হলেরসামনে লোকাল ছাত্রনেতা রসায়ণ বিভাগের ছাত্র নজরুল ইসলামকে চোখের সামনে মর্মান্তিক ভাবে ছুরিকাঘাত করতে দেখেছি। প্রতিপক্ষের আঘাতে চোখের সামনে এ দৃশ্য দেখে শিহরিত হয়েছিলাম। এই দুই পক্ষের দ্বন্দে¦ বেশ কিছু দিন ছাত্রদলের এন্ট্রি লোকাল গ্রুপ বাইরেছিল হঠাৎ একদিন অতর্কিত ভাবে তারা ক্যাম্পাসে ঢুকে আলবিরুনী হল দখল করে নেয়। সেই দিনের ভয়াবহ দৃশ্য এবং খবর সংগ্রহের ঘটনা ছিল ঝুকি পূর্ণ। ছাত্র শিবিরের অতর্কিত আক্রমণও ছিল ভয়াবহ। অনেক ঝুঁকি নিয়ে এসব খবর সংগ্রহ করে পত্রিকায় প্রেরণ করেছি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও একটা পেশাদারিত্ব কাজ করেছে। সাংবাদিকতা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নব্বই এর দশকের নানা স্মতি আমাকে আবেগে তাড়িত করে।
ড. মেজবাহ উদ্দিন তুহিন, গবেষক ও লেখক, আঞ্চলিক পরিচালক, বাউবি।



































