প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার আহবান প্রত্যাখ্যান, শহীদ মিনার থেকে সমন্বয়কদের ঘোষণা
বিশেষ প্রতিবেদক : বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সরকার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করেছেন। গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শহীদ মিনারে সমবেত ছাত্র-জনতার উদ্দেশে বক্তব্য তিনি এ দাবি জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রিসভাকে পদত্যাগ করতে হবে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মন্ত্রিসভার সব সদস্যের পদত্যাগ দাবিতে আজ রোববার (৪ আগস্ট) সারাদেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে বলে সমাবেশ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সময় অন্যান্য সমন্বয়কারিরা তার পাশে ছিলেন।
সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আর এক মিনিটও এই সরকার থাকবে না। এক দফা এক দাবি শেখ হাসিনার পদত্যাগ। তিনি বলেন, আমরা আর তাদের কাছে কী বিচার চাইব? তারাই তো খুনি। আমাদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আপনাদের আন্দোলনের কারণে আমরা ছাড়া পেয়েছি। আজকেও গুলি চলেছে। এই পরিস্থিতিতে এক দফা ঘোষণা করছি। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আলোচনার দরজা খোলা রয়েছে’। তিনি আগেই বুঝেছেন, দরজা খোলা রাখার সময় হয়েছে। আমরা আসছি। এই যে খুন-হত্যা হয়েছে, এজন্য তাকে পদত্যাগ করতে হবে এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে। শুধু শেখ হাসিনা নন, সব মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, আমাদের এক দফা হলো শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং এই সরকারের লুটপাট-দুর্নীতির বিচার। আমরা জেলের তালা ভেঙে আমাদের ভাইদের আনব। যে অভ্যুত্থান শুরু হয়েছে, এতে সব জনতা যোগ দিন। আমরা সবার সঙ্গে আলোচনা করে সম্মিলিত মোর্চা গঠন করব। আমরা আমাদের দেশের রূপরেখা ঘোষণা করব। আগামীকাল থেকে সর্বত্র অসহযোগ আন্দোলন হবে।
এই সমন্বয়ক বলেন, যদি ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ জারি হয় আমরা মেনে নেব না। এখন ছাত্র-জনতার এগিয়ে আসতে হবে। আপনারা শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ আন্দোলন পালন করবেন। সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, এটা জনগণ মানবে না। আপনারা যদি অস্ত্র চালান তাহলে প্রতিরোধ হবে। আমরা সব গণহত্যার বিচার করব বাংলার মাটিতে।
পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী আন্দোলনের সাথে একাত্বতা ঘোসণা করে রাজধানী ঢাকার শান্তিনগর, বাড্ডা, রামপুরা, উত্তরা, মিরপুর, যাত্রাবাড়ি, খিলগাঁওসহ নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে ছাত্র-শিক্ষকসহ আন্দোলনকারিরা মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমবেত হয়।
শান্তিনগর মোড়ে শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা, নেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
শান্তিনগর মোড়ে বিক্ষোভ
রাজধানীর শান্তিনগর মোড়ে বিক্ষোভ ও মিছিল শুরু করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের পাশাপাশি বিক্ষোভে অনেক অভিভাবককে যোগ দিতে দেখা গেছে। সকাল থেকে স্বল্প যান চলাচল করলেও এ সময় তাও বন্ধ হয়ে যায়।
দুপুর শোয়া ২টার দিকে রাজধানীর শান্তিনগর চৌরাস্তার মোড়ে আশপাশের গতকাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অবস্থান নেন। কিন্তু সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সদস্যদের উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
কোটা সংস্কার দাবির আন্দোলনে সারা দেশে হামলা করে হত্যার প্রতিবাদ ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নয় দফা দাবি আদায়ে বিক্ষোভ মিছিল করছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
সারা দেশে ছাত্র-নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা করে খুনের প্রতিবাদ ও ৯ দফা দাবিতে শনিবার সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল ও রোববার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। শুক্রবার রাতে ঘোষণা দেওয়া এ কর্মসূচিতে তারা সারা দেশের আপামর জনসাধারণকে সফল করার আহ্বান জানানো হয়।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী রাজধানীর আফতাবনগরে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে কয়েকশ’ শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করছেন। অন্যদিকে জহুরুল ইসমাল সিটি গেটের সামনে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
শনিবার সকাল সাড়ে ১১টা থেকে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিক্ষোভ কর্মসূচিতে শিক্ষক, অভিভাবক ও মুক্তিযোদ্ধা সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য প্রদান করেন।
এসময় তারা বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেছেন। ‘কাঁদতে আসেনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’, ‘আর দিব না করতে আঘাত শক্ত কার প্রজার হাত’, ‘গণহত্যার বিচার কর, নাইলে গদি খালি কর’ এবং ‘লাশের মধ্যে জীবন দে, নাইলে গদি ছেড়ে দে’, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘আমি কে তুমি কে রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের মাথায় লাল কাপড় বাঁধা দেখতে পাওয়া যায়।
বিক্ষোভ কর্মসূচিতে ইম্পেরিয়াল কলেজ, ব্রাক ইউনিভার্সিটি, কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি, আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশ নেয়।
বাড্ডা থানার ওসি আব্দুল সালাম সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে কোন নাশকতাকারী ঢুকে যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে এজন্যই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের এখানে অবস্থান নেওয়া। তারা যাতে নাশকতায় জড়িয়ে না পড়ে সেজন্য এ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহসড়ক অবরোধ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুযায়ী রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বৃষ্টিতে ভিজে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন।
গতকাল দুপুর থেকে তারা ঢাকার প্রবেশমূখ দখল করেন।এ সময় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরুর পর থেকে আশপাশের দোকানপাট বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারেও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
মাথায় জাতীয় পতাকা বেঁধে এ সময় আন্দোলকারীদের ওপর গুলি বন্ধের দাবি জানিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে সরকার চাকরিতে কোটা বাতিল করে। এটি চ্যালেঞ্জ করে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা রিট করেন। গত জুন মাসে হাইকোর্ট কোটা বহাল রাখেন।
গত ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। পরে আন্দোলন বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এতে চট্টগ্রামে এক ছাত্রদল নেতাসহ তিনজন, ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে ছাত্রলীগ কর্মী ও একজন হকার এবং রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সাঈদ নামে এক ছাত্রের মৃত্যু হয়। আর ১৮ জুলাই ‘কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষিত হয়। ওইদিন সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ সংঘাত ২১ জুলাই পর্যন্ত চলতে থাকে। ঘটে শতাধিক প্রাণহানি। বিভিন্ন স্থাপনায় ধংসযজ্ঞ চালানো হয়। এর মধ্যে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে আপিল বিভাগ। তারপরও সংঘাত না থামায় কারফিউ জারি করা। মামলা হয়। চলে গ্রেপ্তার ও ব্লক রেইড।
এমন পরিস্থিতে বিচারের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখে।
উত্তরায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিক্ষোভে অভিভাবকরাও
রাজধানীর উত্তরায় বিএনএস সেন্টারের পাশের রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। সেখানে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবকেরাও রয়েছেন। আজ বিকাল সাড়ে ৩টার পর উত্তরা ও এর আশপাশের এলাকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ড হাতে ফুটপাতে শিক্ষার্থীদের অবস্থান নিতে দেখা যায়।
অন্যদিকে, শনিবার বেলা দেড়টার বিএনএস সেন্টারের সামনে অবস্থান নিয়েছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। সেখানে ছাউনি বানিয়ে অবস্থান করছেন তারা। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুটি দল বিএনএস সেন্টারের নিচে রয়েছে।
বিএনএস সেন্টারের পেছনের গলিতে দাঁড়ানো এক অভিভাবক বলেন, ‘আমরা এসেছি আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তার জন্য। আমরা শান্তি চাই। আর একটা গুলিও নয়। এই গুলি আমাদের টাকায় কেনা।’
অভিভাবকদের অনেকে বলেন, ‘ওরা গুলি করুক, আমরা সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করবো। কেউ ভয়ে পালিয়ে যাবো না।’
শিক্ষার্থীদের প্ল্যাকার্ডে ‘আমার ভাই কবরে, খুনি তুই কেন বাইরে’, ‘পুলিশ তুমি কার, জনগণের নাকি শেখ হাসিনার!’ এ রকম নানা স্লোগান লেখা ছিল।
সরেজমিনে দেখা যায়, বেলা দেড়টার দিকে আজমপুর আমির কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থান করছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। সেখানে ছাউনি বানিয়ে অবস্থান করছেন তারা।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক সংলগ্ন বিএনএস সেন্টারের সামনে ও জসীমউদ্দীন এলাকার মূল সড়কে অবস্থান নিয়েছে পুলিশ।



































